আর্ন্তজাতিক
বাজওয়া পরিবারের ‘বিপুল সম্পদ’ নিয়ে হইচই পাকিস্তানে
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়ার পরিবারের বিপুল সম্পদের তথ্য ফাঁস করেছে দেশটির একটি অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম সাইট। কর নথির বরাতে ফ্যাক্টফোকাস নামের সাইটটি এ তথ্য ফাঁস করেছে, যা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির অর্থমন্ত্রী ইসহাক দার। বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ফ্যাক্টফোকাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেনাপ্রধানের পরিবার গত ছয় বছরে বিলিয়নেয়ার বা ধনকুবের হয়েছে। বাজওয়া পরিবারের সদস্যরা আন্তর্জাতিক ব্যবসা শুরু করেছেন, বিভিন্ন দেশের রাজধানীতে সেগুলো স্থানান্তরিত করেছেন এবং বিদেশি প্রপার্টি কিনেছেন।
এই প্রক্রিয়ায় তৎকালীন চিফ অব আর্মি স্ট্যাফ (সিওএএস) বাজওয়ার এক পুত্রবধ তার বিয়ের আগে মাত্র ৯ দিনে বিলিয়নেয়ার হয়েছেন। লাহোরের এই নারীর অন্য তিন বোনেরও সম্পত্তি বেড়েছে বহুগুণে। মাহনুর সাবিরের নামে ২০১৮ সালের ২৩ অক্টোবর গুজরানওয়ালায় আটটি ডিএইচএ প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর ৯ দিন পর কামার জাভেদের ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।
পাকিস্তানি এই জেনারেলের পরিবার লাহোরের সাবির হামিদের সঙ্গে যৌথ ব্যবসা শুরু করেছেন। মিঠু নামে পরিচিত সাবির হলেন মাহনুরের বাবা ও বাজওয়ার ছেলের শ্বশুর। একই বছর হামিদ পাকিস্তানের বাইরে মূলধন স্থানান্তর এবং বিদেশে সম্পদ ক্রয় শুরু করেন।
করাচি ও ইসলামাবাদের গুলবার্গ গ্রিনসে জেনারেলের স্ত্রী আয়েশার বড় খামারবাড়ি আছে। এ ছাড়া একাধিক আবাসিক প্লট এবং ডিএইচএ প্রকল্পে বাণিজ্যিক প্লট এবং প্লাজাসহ বহু বিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পত্তির মালিক তিনি। কামার বাজওয়া যখন সিওএএস ছিলেন তখনই লাহোরের ডিএইচএর চতুর্থ ও ষষ্ঠ পেজে দুই বাণিজ্যিক প্লাজার মালিক হয়েছেন। তখন তিনি তার যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাকাউন্টে প্রায় অর্ধ মিলিয়ন ডলার রাখতেন।
পাকিস্তানের গোপন কর প্রতিবেদন-এফবিআরে দেখা যায়, জেনারেলের স্ত্রীকে একাধিকবার সম্পদ গোপনের জন্য সতর্ক করা হয়েছে। ফ্যাক্টফোকাস একটি ফলো-আপ প্রতিবেদনে এই বেকর্ডগুলোর বিস্তারিত প্রকাশ করবে।
বাজওয়ার পরিবার ২০১৮ সালে তেলের ব্যবস্থা শুরু করে। প্রথমে এটি দুবাইয়ে পাকিস্তানের ট্যাক্স সদরদপ্তরে এবং কয়েক মাসের মধ্যে পাকিস্তানজুড়ে এটি বিস্তৃত হয়। গত তিন বছর ধরে অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও ফ্যাক্টফোকাস জেনারেলের দুই ছেলের নামে সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করতে পারেনি।
সেনাপ্রধান বাজওয়ার পরিবারের কথিত কর নথি–সম্পর্কিত ফ্যাক্টফোকাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী পাকিস্তান এবং এর বাইরে মিলিয়ে সেনাপ্রধানের জ্ঞাত সম্পদ ও ব্যবসার পরিমাণ ১ হাজার ২৭০ কোটি রুপি। প্রতিবেদনে ২০১৩ থেকে ২০২১ সাল নাগাদ জেনারেল বাজওয়া ও তার পরিবারের জমা দেওয়া কথিত সম্পদের তথ্য তুলে ধরা হয়।
তিবেদনে দাবি করা হয়, ২০১৬ থেকে ৬ বছরে জেনারেল বাজওয়ার স্ত্রী আয়েশা আমজাদের (ঘোষিত ও জ্ঞাত) সম্পদের পরিমাণ শূন্য থেকে ২২০ কোটি রুপিতে গিয়ে ঠেকেছে। অথচ ২০১৬ সালে ঘোষণায় তিনি বলেছিলেন, তার মাত্র আটটি সম্পত্তি আছে। তবে সেগুলোর বর্ণনা করা হয়নি। এতে বলা হয়, এই সম্পদের মধ্যে সেনাবাহিনী থেকে তার স্বামীকে দেওয়া আবাসিক প্লট, বাণিজ্যিক প্লট ও বাড়িগুলো হিসাবে ধরা হয়নি।
পুত্রবধূ মাহনুর সাবিরের ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ ২০১৮ সালের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে ছিল শূন্য। পরে ২০১৮ সালের ২ নভেম্বর তা ১ হাজার ২৭১ মিলিয়ন (প্রায় ১২৭ কোটি) রুপিতে গিয়ে দাঁড়ায়। মাহনুরের বোন হামনা নাসিরের সম্পদ ২০১৬ সালে ছিল শূন্য, যা পরের বছর ‘কয়েক শ’ রুপিতে গিয়ে ঠেকে।
সেনাপ্রধানের বেয়াই সাবির হামিদের ২০১৩ সালের কর রিটার্ন ছিল ১০ লাখ রুপিরও কম। ২০১৫ সালে তার ব্যবসার মূলধনের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ কোটি ২০ লাখ রূপিতে। ২০২০ সালে এতে তার বিদেশে সম্পত্তির পরিমাণ ৩১ কোটি ২৩ লাখ ছাড়ায়। শুধু সাবির হামিদই নয়, তার ভাই নাসির হামিদও এখন প্রভাবশালী ও লাহোরের সম্পদশালী ব্যক্তি।
২০১৪ সালের ট্যাক্স রিটার্ন ২০১৬ সালে জমা দেওয়া হয়। পরে ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, নাসির, তার স্ত্রী ও কন্যার নামে ১২ মিলিয়ন রূপির মূলধন ও ১১ মিলিয়ন রূপির সম্পত্তি রয়েছে। ২০২১ সালের সম্পত্তির বিবরণীতে দেখা যায়, নাসিরের সম্পত্তির পরিমাণ ৩ বিলিয়ন রূপির।
এই বিষয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মহাপরিচালক (ডিজি) ইন্টার-সার্ভিস পাবলিক রিলেশন্সের (আএসপিআর) মেজর জেনারেল বাবর ইফতিখারের সঙ্গে টানা তিনদিন ধরে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন ফ্যাক্টফোকাসের সাংবাদিক আহমদ নূরানি। তবে মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সাবির হামিদের থেকেও প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি।
ডনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনাপ্রধান বাজওয়ার পরিবারের কর নথি ‘বেআইনি ও অন্যায্যভাবে’ ফাঁসের বিষয়টি সোমবার গুরুত্বের সঙ্গে নেন অর্থমন্ত্রী। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এটি আইনে দেওয়া কর তথ্যের সম্পূর্ণ গোপনীয়তার স্পষ্ট লঙ্ঘন।’
মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, আজ অবধি অজানা কর্মচারীদের পক্ষ থেকে এই গুরুতর ত্রুটির পরিপ্রেক্ষিতে কর আইনের লঙ্ঘন, কেন্দ্রীয় রাজস্ব বোর্ডের (এফবিআর) তথ্য হাতিয়ে নেওয়া ও অর্পিত দায়িত্ব ভঙ্গের বিষয়টি তদন্তে ব্যক্তিগতভাবে নেতৃত্ব দিতে প্রধানমন্ত্রীর রাজস্ববিষয়ক বিশেষ সহকারী তারিক মাহমুদ পাশাকে নির্দেশনা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
পাকিস্তানভিত্তিক ফ্যাক্টফোকাস ডিজিটাল মিডিয়া ডেটানির্ভর অনুসন্ধানী সংবাদ প্রতিবেদন তৈরি করে থাকে। এই সাইটটি আগেও পিটিআইপ্রধান ইমরান খান ও সাবেক স্বৈরশাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফকে নিয়ে তহবিল তছরুপের বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।
২০২০ সালে এই ওয়েবসাইট অফশোর কোম্পানিতে চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর অথোরিটির সাবেক চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আসিম সালিম বাজওয়া ও তার পরিবারের কথিত সম্পদ ও ব্যবসা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গত বছর ওয়েবসাইটটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ও তার মেয়ে মরিয়াম নওয়াজকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।

