যুক্তরাষ্ট্র
ট্রাম্পকে কাঠগড়ায় তোলার এটাই সময়
অ্যান্ড্রু মিত্রোভিচা : অ্যাটর্নি জেনারেল মেরিক গারল্যান্ড একজন অকাজের লোক। যখন ইতিহাস আর আইনের শাসনের তাগিদ তাকে তাড়া দিচ্ছিল তখনো তিনি উসখুস করেছিলেন। আরও খারাপ যেটা তা হলো, গত বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রধান আইনজীবী নিযুক্ত হওয়ার সময় নেওয়া শপথের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন তিনি। মেরিক গারল্যান্ড তার ডান হাত তুলে দেশের সংবিধানকে সব দেশি-বিদেশি শত্রুর মোকাবিলায় সমর্থন ও রক্ষা করার শপথ নিয়েছিলেন। তিনি আরও সম্মত হন, কোনো ‘মানসিক সীমাবদ্ধতা বা এড়ানোর উদ্দেশ্য ছাড়া’ এই দায়দায়িত্ব মুক্তমনে মেনে নিতে।
কিন্তু মেরিক গারল্যান্ড তার কথা রাখেননি। বরং তিনি এমনকি একজন সাবেক প্রেসিডেন্টের বেপরোয়া আইনভঙ্গের মুখেও সংবিধান রক্ষা করার বিষয়ে নিজের ‘দায়বদ্ধতা’ এড়িয়ে গেছেন। ওই প্রেসিডেন্ট নিজে সমুন্নত রাখার শপথ নিয়েও সংবিধানের শত্রুতে পরিণত হয়েছিলেন।
দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে গারল্যান্ড একটি ক্ষমার অযোগ্য বা কেউ কেউ বলেন ‘কাপুরুষোচিত’ কাজ করেছেন। তিনি অন্য কাউকে তার হয়ে কাজটি করতে বলেছিলেন। যেহেতু ৪৫তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য মামলা চালানোর চেয়েও দৃশ্যত আরও জরুরি কাজ হাতে ছিল তার।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের পাবলিক ইন্টিগ্রিটি বিভাগের সাবেক প্রধান এবং একজন অভিজ্ঞ যুদ্ধাপরাধবিষয়ক কৌঁসুলি জ্যাক স্মিথকে ট্রাম্পের বিষয়ে তদন্তে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য বিশেষ কাউন্সেল হিসেবে বেছে নিয়েছেন মেরিক গারল্যান্ড। এ কাজের মাধ্যমে তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে তার প্রথম দিনে বিভাগের কর্মচারী এবং বড় পরিসরে দেখলে, দেশের লাখো আলোকিত নাগরিককে দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গিয়েছেন।
মেরিক গারল্যান্ড বলেছিলেন, ‘এমনটা হতে পারে না যে, বন্ধুদের জন্য এক নিয়ম এবং শত্রুদের জন্য অন্য নিয়ম, ক্ষমতাবানদের জন্য এক নিয়ম এবং ক্ষমতাহীনদের জন্য অন্য নিয়ম, ধনীদের জন্য এক নিয়ম এবং গরিবদের জন্য অন্য নিয়ম...। একসঙ্গে মিলে আমরা সবাই কথায় ও কাজে দেখাব যে, বিচার বিভাগ সবার জন্য ন্যায়বিচারের পথ অনুসরণ করে এবং আইনের শাসন মেনে চলে।’
দেখা গেল (যাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই) গারল্যান্ড তার কাজের মাধ্যমে আবারও প্রমাণ করেছেন, ধনী ও ক্ষমতাবানদের জন্য এক বিধান আর দরিদ্র ও ক্ষমতাহীনদের জন্য আরেক। আর তিনি এ-ও নিশ্চিত করেছেন, ‘সমান ন্যায়বিচার’ হচ্ছে একটি সেকেলে বোকাটে কথা। একজন অ্যাটর্নি জেনারেলের বুলিসর্বস্ব বক্তৃতার জন্য যা বেশি উপযোগী, যিনি কিনা ভয় বা পক্ষপাতহীনভাবে আইনের শাসন প্রয়োগ করার চেয়ে নায্যতার বাহ্যিক প্রদর্শনীতে বেশি আগ্রহী।
আপনি আমি জানি, কোনো দরিদ্র এবং ক্ষমতাহীন আমেরিকান নাগরিক অভ্যুত্থানে উসকানি দিলে বা তার বাড়িতে রাষ্ট্রীয় গোপন নথির স্তূপ পাওয়া গেলে বিচার বিভাগের আইনের অমোঘ হাতুড়ি দ্রুত এবং কঠিনভাবে তার মাথায় নেমে আসত।
মেরিক গারল্যান্ড স্মিথের নিয়োগের ঘোষণা দেওয়ার সময় এই দ্বিমুখিতা মেনে নিয়েছিলেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, ‘কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে তদন্ত এবং মামলা পরিচালনা করতে একজন বিশেষ কৌঁসুলি নিয়োগ করা জনস্বার্থের জন্য অনুকূল।’
অবিশ্বাস্য হলেও গারল্যান্ড কার্যত এটাই বলছেন যে, প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে তিনি নিজে আইনের শাসন রক্ষার একজন ‘স্বাধীন’ হেফাজতকারী বিবেচিত হতে পারেন না। এতে তিনি নিজে এবং ‘সমান ন্যায়বিচার’ সম্পর্কে তার সমস্ত মিষ্টি কথাবার্তা কেবল অপ্রাসঙ্গিকই নয়, প্রতারণামূলকও হয়ে দাঁড়ায়। অ্যাটর্নি জেনারেল গারল্যান্ড মনে করতে পারেন, ‘বিশেষ পরামর্শক’ নিয়োগের মাধ্যমে কংগ্রেসের ভেতরে এবং বাইরে ট্রাম্প সমর্থকদের দলকে কথিত ‘বিশেষ শক্তির বাড়াবাড়ি’ সম্পর্কে চিৎকার চেঁচামেচি করা থেকে বিরত রাখা যাবে। বিষয়টি তাই হলে বলতে হবে, গারল্যান্ডের বিবেচনা এতটাই পক্ষপাতপূর্ণ যে তৎকালীন রিপাবলিকান সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা মিচ ম্যাককনেল ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্টে তার মনোনয়ন বাতিল করে সম্ভবত দেশের জন্য একটি উপকারই করেছিলেন।
আশা করি, জ্যাক স্মিথ দি হেগ থেকে ওয়াশিংটন আসার আগে আত্মরক্ষার কায়দাকানুন জোরেশোরে রপ্ত করে নিয়েছেন। কারণ ট্রাম্প, তার কংগ্রেসের ভাইবেরাদর আর ফক্স নিউজ চ্যানেলের লোকজন এখন তার কাজের ভুল ধরার জন্য মুখিয়ে থাকবে। স্মিথের কাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলার জন্য সমন্বিত চেষ্টা চালাতে তারা নখে শান দিয়ে রাখবেন। তবে জ্যাক স্মিথ বা আমাদের এ নিয়ে মাথা ঘামানো উচিত নয়। ট্রাম্প গংকে শান্তিমতো তাদের নিভৃত কোণে বসে বিলাপ করতে দিন।
গারল্যান্ড আমেরিকানদের আশ্বস্ত করে তার প্যাঁচানো বিবৃতি শেষ করেছেন এই বলে, ‘এ পর্যন্ত যতটা কাজ হয়েছে এবং স্মিথের যে অভিজ্ঞতা তার পরিপ্রেক্ষিতে আমি নিশ্চিত তার নিয়োগ তদন্তের কাজের গতি ধীর করবে না।’ তবে আমি নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, গারল্যান্ড এবং তার চির দ্বিধাগ্রস্ত বিচার বিভাগ যে গতিতে কাজ করে বরফে ঢাকা ফুটপাথ দিয়ে পথচারীরাও তার চেয়ে জোরে চলে।
শোনা গেছে, প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন একান্ত আলাপে ট্রাম্পের বিষয়ে তদন্তে গারল্যান্ডের ঢিলেমি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। বাইডেনের ভাষায়, ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির মারাত্মক বিদ্রোহে ট্রাম্পের প্ররোচনা ‘আমেরিকান নাগরিকসমাজ এবং আমেরিকার গণতন্ত্রের গলায় একটি ছুরিকাঘাতেরই সমান।’
এপ্রিলে নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকা লিখেছিল, বাইডেন চান গারল্যান্ড যেন দোদুল্যমান বিচারকের চেয়ে বরং সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নিতে ইচ্ছুক এক কৌঁসুলির মতোই কাজ করুন।
এখন নিজেকে তদন্ত থেকে প্রত্যাহার করে নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল ট্রাম্প ও তার সঙ্গীসাথীদের পুরস্কৃত করলেন। ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা আগাম ঘোষণার সুযোগ করে দিলেন তিনি। হাতে তুলে দিলেন এমন কিছু যা সব চালবাজেরই প্রয়োজন হয়। আর তা হচ্ছেসময়। গারল্যান্ডের তুলে দেওয়া বাড়তি সময়টা ট্রাম্প কাজে লাগাতে পারবেন তার অবাস্তব কিন্তু রাজনৈতিক ফায়দা আনার উপযোগী প্রচারণায়। তিনি বলবেন, প্রতিহিংসা পরায়ণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আবার তার ‘আমেরিকাকে মহান করার স্বপ্ন’ বানচাল করে দিতে উদ্যত। স্মিথের তদন্ত চলতে চলতে নতুন বছরের কিছুদিন পর্যন্ত ভালোভাবেই লেগে যাবে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ওপরও প্রভাব ফেলবে তা।
মিডিয়া রিপোর্টে স্মিথকে একজন দৃঢ়চেতা, অভিজ্ঞ কৌঁসুলি হিসেবেই বর্ণনা করা হচ্ছে। আমি মনে করি, যারা ট্রাম্পকে কাঠগড়ায় দেখতে আগ্রহী তারা এতে আশ্বস্ত হবেন। ট্রাম্পের সুরক্ষার দেয়াল দৃশ্যত ক্রমে ধসে পড়ছে, যদিও তিনি বহুবার প্রাপ্য সাজা এড়ানোর এক অসাধারণ ক্ষমতা দেখিয়েছেন। তবে নিজের বিরক্তিকর সতর্কতা এবং চির হতাশা সত্ত্বেও, আমি নিশ্চিত যে এবার ট্রাম্প ঠিকই অভিযুক্ত হবেনগারল্যান্ডের নামকাওয়াস্তে অনুমোদনের মাধ্যমে। তবে যদি কখনো সেই মহিমান্বিত দিনটি আসেও তা হবে অ্যাটর্নি জেনারেলের চরম বিরক্তিকর সিদ্ধান্তহীনতার পাহাড় ঠেলে। অ্যাটর্নি জেনারেল গারল্যান্ড যাকে ‘সঠিক’ বলেন তা করার জন্য তার প্রশংসার কিছু নেই। কারণ তিনি তা অর্জন করেননি।
বাইডেন ঠিকই বলেছেন। ট্রাম্প আবার সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ হওয়ার যোগ্য নন। তিনি আমেরিকার ইতিমধ্যে জীর্ণশীর্ণ গণতন্ত্রের বুননের জন্য এক সাক্ষাৎ বিপদ। তাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কয়েদি ট্রাম্পে পরিণত করার সময় এসেছে হে আমেরিকা। আর তা করতে হবে এখনই। না হলে আর হবে না। অ্যান্ড্রু মিত্রোভিচা আলজাজিরার টরন্টোভিত্তিক সাংবাদিক

